দেশ ছেড়ে বিদেশ উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমান অভিবাসী কর্মী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা। তাঁদের রোজগারে দেশের অর্থনৈতিক চাকার পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু এই অভিবাসী কর্মী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সব সময় ভোগান্তির মধ্যেই টিকে থাকতে হয়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে সব সময়ই পর্যাপ্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হন তাঁরা।
শুধু বঞ্চিতই নয়, দূতাবাসগুলোতে নানা রকম ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এরই মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালন করা হবে। সেই লক্ষ্যে আজ বুধবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস-২০২৫’ এবং ‘জাতীয় প্রবাসী দিবস-২০২৫’ একসঙ্গে পালন করা হবে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উন্নত শিক্ষা অর্জনের জন্য পাড়ি জমান।
উন্নত শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা সেসব দেশে উপার্জনও করে, যা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করেন। তবে শিক্ষার্থীদের যাওয়া দেশগুলোতে অবস্থান করা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য মতে, বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো দেশের মানুষের প্রয়োজনে উদারভাবে কাজ করে না। জরুরি কোনো প্রয়োজন হলেও দূতাবাসগুলোতে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিলে দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।
আর এই অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্যও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকতে হয়। এ ছাড়া দূতাবাসগুলোতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও করেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে রাশিয়ায় অধ্যয়নরত পিএচডি শিক্ষার্থী আবুল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী এ দেশে পড়তে আসেন। অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে আসেন, অনেকে নিজ খরচে। বর্তমানে শ্রমজীবীরাও আসছেন।
তবে দূতাবাস থেকে দেশের মানুষজনকে কখনো গাইডলাইন দেওয়া হয় না। দূতাবাসের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনময় বা খোঁজও নেওয়া হয় না। এমনকি দূতাবাসের হটলাইন সেবা থাকলে খুব কমই কল রিসিভ করে।’
একই অভিযোগ জানিয়ে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী নাইম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দূতাবাসের দ্বারস্থ হলে যেকোনো কাজেই দীর্ঘ সময় চলে যায়। সঠিক উপায়ে গেলে নানা জটিলতা দেখানো হয়।’
বিদেশে অবস্থানরত পেশাজীবী অভিবাসী ও কর্মীরাও নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী কর্মী মাসুদ রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাসপোর্টের ভোগান্তি এখনো চলমান। পাসপোর্ট হাইকমিশন থেকে ডেলিভারি দিলেও এটি ই-স্কেলে গিয়ে অ্যাক্টিভ করতে হয়। এতে দুই দিন সময় চলে যায়। হাইকমিশন চাইলে এটি একসঙ্গে করে দিতে পারে। এ ছাড়া কল সেন্টার এখনো বাড়ায়নি। এর ফলে সহজে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।’ পরিবার নিয়ে ইতালিতে বসবাস করা পেশাজীবী সাজেদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায়ই আমাকে দেশের জমিজমা, পারিবারিক বিষয় ও আত্মীয়-স্বজনের কাজে দূতাবাসে যেতে হয়। কিন্তু প্রতিটি কাজে দূতাবাসের সময় পাওয়া কষ্টকর হয়ে যায়।’ তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এ সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাবলিক ডিপ্লোমেসি বিভাগের মহাপরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে কিছু সমস্যার কথা উঠে আসে, যার পেছনে অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা থাকে। তারা সেবাপ্রত্যাশীদের বিভ্রান্ত করে জটিলতা তৈরি করে। তবে এ ধরনের সমস্যা দিন দিন কমছে এবং ভবিষ্যতে আরো কমবে।’
এক বছরেও চালু হয়নি নতুন কিংবা পুরনো বন্ধ হওয়া শ্রমবাজার : বাংলাদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত শ্রমবাজার এক বছরেও চালু করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এমনকি এ বাজারগুলোর আগে বন্ধ হওয়া ৯টি শ্রমবাজারের একটিও এ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে প্রতিনিয়তই কমছে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার। এতে জনশক্তি রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা দেখছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা করে নতুন বাজার চালু এবং পুরনো বাজার খুলতে না পারলে ক্ষতির মুখে পড়বে খাতটি।
সৌদি আরবেও তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা : সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় এবং ভরসার শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর মূল জনশক্তির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কর্মী সৌদি আরবে যান। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত যে ১০ লাখ ৭১ হাজার ৫৭০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, এর মধ্যে সাত লাখ ১২ হাজার ৪৪ জন কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। অর্থাৎ মূল জনশক্তির ৫০.৪৯ শতাংশ কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। তবে সৌদি আরবে এখনো বেশিসংখ্যক কর্মী গেলেও সেখানকার বাজারেও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, এই বাজারে কাজ করতে গেলে কর্মীদের ‘তাকামুল’ নামের একটি সনদ নিয়ে যেতে হয়। তাকামুল সনদের পরীক্ষা ছাড়াও দেশটিতে যাওয়ার পর ইকামা, চাকরি, বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কর্মীরা। এতে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটে তাঁদের।
প্রধান উপদেষ্টার বাণী : বিশ্ব অভিবাসী দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও অগ্রগতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা অপরিসীম। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’










